রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা বন্ধ ও রুগ্ন শিল্প-কারখানা চালুর উদ্যোগ প্রসঙ্গে

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   |   শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা বন্ধ ও রুগ্ন শিল্প-কারখানা চালুর উদ্যোগ প্রসঙ্গে
Share

সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বন্ধ ও রুগ্ন শিল্প-কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা ৫০টি শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরিত হবে। এদিকে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক পুন:অর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই তহবিলের আওতায় বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য পুন:অর্থায়ন স্কীম হাতে নেয়া হচ্ছে। এই স্কীম বাস্তবায়নের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ফান্ড গঠন করা হবে। বড় শিল্পের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা কলে অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে। এই তহবিল থেকে প্রধানত এক থেকে দেড় বছরের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোন দেয়া হবে। দেশে বন্ধ ও কার্যক্রম স্থগিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০টি বলে জানা গেছে। আশা করা হচ্ছে, এই বিপুল সংখ্যক শিল্প-কারখানাকে যদি উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হয় তাহলে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া জোরদার হবে।

সরকার বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছেন এটি একটি সাহসী উদ্যোগ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বন্ধ এবং লোকসানি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করে চালুর সুফল সম্পর্কে বহু প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। প্রশ্ন হলো, ব্যক্তি মালিকানায় যেসব শিল্প-কারখানা বন্ধ আছে সেগুলো কি পুরনো মালিকের অধীনেই চালু করা হবে, নাকি মালিকানা বদল করে প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে? ব্যক্তি মালিকানায় যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে তাদের অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, মালিকের অদক্ষতা এবং অযোগ্যতা কারখানা বন্ধ হবার একটি বড় কারণ। তাই অদক্ষ উদ্যোক্তার হাতে যদি বন্ধ কারখানা চালুর জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় সেখানে ‘রেজাল্ট জিরো’ হবার আশঙ্কাই বেশি। মাঝখান থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পুন:অর্থায়ন করবে তা ভেস্তে যাবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

এখানে আমাদের একটি পরিস্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারখানাগুলোর যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, কাঁচামালের উৎস এগুলো যাচাই করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিরূপন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে যেসব শিল্প-কারখানা আছে সেগুলো লাভজনক হোক আর লোকসানি হোক তাদের ঢালাওভাবে বিরাষ্ট্রীয়করণ করতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করা হয়, রাষ্ট্র বা সরকার কখনোই দক্ষ উৎপাদক হতে পারে না। একমাত্র মালিকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে যেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় সেগুলোই সর্বোচ্চ মাত্রায় উৎপাদনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত হয় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান কখনোই সর্বোচ্চ মাত্রায় জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র নিজে পরিচালনা করে না। সরকার তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি-অনাচার মূল উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়। যারা এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব লাভ করেন তারা কখনোই প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে মনে করেন না। কাজেই তারা চেষ্টা করেন কিভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটে নেয়া যায়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির সঙ্গে দুর্ভাগ্য যুক্ত না হলে কারো চাকরি যায় না। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যেহেতু সরাসরি মালিকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় তাই সেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মালিক নিশ্চয়ই চাইবেন না তার কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারি দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন করুক এবং আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে লোকসানে পতিত করুন। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সামান্য দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলেই একজন কর্মীকে ছাটাই করা হয়।

সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন সেক্টর সঠিকভাবে বিকশিত হওয়ার উদাহরণ খুব বেশি নেই। ব্যক্তিগত সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হবে আর রাষ্ট্র সেখানে অবকাঠামোগত সাপোর্ট দেবে এটাই উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্র কখনোই ভালো উৎপাদক বা ব্যবসায়ি হতে পারে না। স্বাধীনতার আগে আমাদের এই অঞ্চলে মালিকানার ভিত্তিতে তিন ধরনের শিল্প-কারখানা বা উৎপাদন ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা যেতো। সামান্য কিছু উৎপাদন যন্ত্র ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়। কিছু উৎপাদন ইউনিট ছিল পাকিস্তানি এবং বাঙ্গালি উদ্যোক্তাদের যৌথ মালিকানায়। আর বেশির ভাগ উৎপাদন ইউনিট বা শিল্প-কারখানা ছিল পাকিস্তানি অবাঙ্গালিদের মালিকানায়। এ নিয়ে আমাদের ক্ষোভের অন্ত ছিল না। আমরা কেন শিল্প-কারখানার মালিক হতে পারছি না এটাই ছিল ক্ষোভের মূল কারন। আমরা কখনোই এটা স্বীকার করতে চাইনি যে,একজন মানুষ ইচ্ছে এবং চেষ্টা করলে ভালো কর্মী হতে পারেন কিন্তু চাইলেই ভালো উদ্যোক্তা হতে পারেন না। উদ্যোক্তা হবার জন্য কিছু বিশেষ গুনের প্রয়োজন হয়,যা সবার মধ্যে থাকে না। বাঙ্গালিদের মধ্যে উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল কম। স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালে অথবা বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তানি শিল্পোদ্যোক্তাদের সবাই পাকিস্তানে চলে যায়। ফলে তাদের পরিত্যাক্ত শিল্প-কারখানা পরিচালনা করা জটিল সমস্যায় পরিণত হয়। সেই সময় সরার পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত শিল্প-কারখানা ঢালাওভাবে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেবার পর শিল্প-কারাখানাগুলো যদি বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিক্রি করে দেয়া হতো তাহলে এগুলো ভালো চলতো এবং রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় করার প্রয়োজন হতো না। রাষ্ট্র পাকিস্তানিদের পরিত্যাক্ত শিল্প-কারখানা পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারের পছন্দনীয় ব্যক্তিদের এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তারা দায়িত্বপ্রাপ্তির পর প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের সম্পত্তি মনে করে লুটপাট শুরু করে। এক সময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প কিছুদিনের মধ্যই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। রাষ্ট্রকে এসব প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়।

১৯৭৫ সালের মধ্য আগষ্টের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবর্তন ঘটে। নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এক সময় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হন। তার সময়ে উৎপাদন যন্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালনার নীতি থেকে সরে আসা হয়। এরপর ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে নেবার পর বিরাষ্ট্রীয়করণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৫শ’ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেবার মাধ্যমে বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই দলীয় লোকদের মাঝে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান এমন কম দামে বিক্রি করা হয়েছে যে প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জমির মূল্যও বিক্রয়লব্ধ মূল্যের চেয়ে বেশি ছিল। বন্ধ বা উৎপাদন স্থগিত আছে এমন প্রতিষ্ঠান শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বিক্রি করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যে সব প্রতিষ্ঠান লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত সেগুলো সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। আর লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বিরাষ্ট্রীয়করণ করা যেতে পারে।

দেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর শেয়ার বাজারে ছাড়া যেতে পারে। ব্যক্তি মালিকানাধীনে থাকা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে মার্জারের মাধ্যমে কমিয়ে আনা যেতে পারে। ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা মনে করেন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অর্থায়নের অভাব। উন্নত দেশদগুলোতে দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রধানত পুঁজি বাজারের উপর নির্ভর করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশের উদ্যোক্তাগণ কোন প্রকল্পে অর্থায়নের প্রশ্ন এলে প্রথমেই ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের চিন্তা করেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা পরিশোধের ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়তে হয়। কিন্তু শেয়ার বাজার থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ করলে এই অসুবিধা নেই। কারণ যারা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন তাদের শর্ত দেয়া থাকে যে প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে লাভজনকতা অর্জন না করা পর্যন্ত কোন ডিভিডেন্ড দেয়া হবে না। তাই উদ্যোক্তাদের লভ্যাংশ প্রদান নিয়ে কোন চিন্তায় থাকতে হয় না। শেয়ার বাজার থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ করা হলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। কারণ প্রতিবছর বার্ষিক সাধারণ সভায় উদ্যোক্তাদের শেয়ার মালিকদের নিকট জবাবদিহি করতে হয়। তাই অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ থাকে কম।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যে অবস্থায় রয়েছে তাতে নতুন উদ্যোক্তাদের এই সেক্টর থেকে অর্থায়ন প্রাপ্তি সহজ হবে না। বরং তারা যদি শেয়ার মার্কেট থেকে অর্থায়ন সংগ্রহের চেষ্টা করেন তাহলে সেটাই হবে মঙ্গলজনক। প্রবাসী বাংলাদেশি যারা রেমিট্যান্স প্রেরণ করেন তাদের স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিগণ সাধারণত এই অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে থাকেন। শেয়ার বাজার যদি সঠিক ধারায় প্রবাহিত হয় তাহলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিগণ সেখানে বিনিয়োগ করতে পারবেন। বন্ধ কারখানাগুলো যদি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বাজারে নিয়ে আসা যায় তাহলে শেয়ার বাজার নিশ্চিতভাবেই চাঙ্গা হবে। ্এখন সময় এসেছে বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের।

অনুলিখন: এম এ খালেক

 

Facebook Comments Box
Share
advertisement

Posted ২:৩৬ পিএম | শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

প্রতিদিনের অর্থনীতি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

CHALLENGES OF BANCASSURANCE IN BANGLADESH
(409 বার পঠিত)
advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

সম্পাদক:
এম এ খালেক
Contact

মাকসুম ম্যানশন (৪র্থ তলা), ১২৭, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০

০১৮৮৫৩৮৬৩৩০

E-mail: protidinerarthonity@gmail.com